আমানুল্লাহ আসিফ, স্টাফ রিপোর্টার: ঝুম্কো লতায় জোনাকি, মাঝে মাঝে বৃষ্টি। আবোল-তাবোল বকে কে, তারও চেয়ে মিষ্টি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই পঙক্তির মতোই গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় আলো দিয়ে ভরিয়ে দিতো ‘জোনাকি পোকা’।
জোনাকি বিটল শ্রেণীর একধরনের বাদামি পোকা। জৈব রাসায়নিক ব্যবস্থায় নিজের শরীর থেকে আলো উৎপন্ন করে এই পোকা। যৌন মিলন ঘটানো বা শিকারের উদ্দেশ্যে আলো জ্বেলে থাকে জোনাকি। সব জোনাকির আলো এক নয়। হলুদ, সবুজ, কমলা, নীল ফিকে লাল ইত্যাদি রঙের আলো জ্বালাতে সক্ষম এই পোকা। গবেষণায় এপর্যন্ত প্রায় ২ হাজার জোনাকির প্রজাতি পাওয়া গেছে। গারো পাহাড় অঞ্চলে হলুদ আলোর জোনাকিই বেশি দেখা যেত। আগেকার দিনে গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যা না হতেই জোনাকির আলো জ্বলতে দেখা যেত।
একসময় সীমান্তবর্তী শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট অঞ্চলে বিস্তীর্ণ গারো পাহাড়ি এলাকায় জোনাকি পোকার দেখা মিলতো ব্যপকভাবে।
সময়ের বিবর্তনে পাহাড় থেকে গাছ কর্তন করে বন উজাড় ও অত্যাধিক আলোর দূষনে হারিয়ে যাচ্ছে জোনাকিসহ নানা প্রাণী। এমন চলতে থাকলে ভবিষ্যত প্রজন্ম এই পোকা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবেনা বলে ধারণা প্রবীণ ব্যক্তিদের।
রাতে বের হওয়া জোনাকিগুলো দিনে ঝোপজঙ্গল, নদী, ডোবা বা ঘাসের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে। শামুকের ডিম, ক্ষুদ্রাকৃতির পোকা, কেঁচো, আবর্জনা এদের খাদ্য। বয়স্ক জোনাকিরা ফুল ও ফলের মধু বা রস খেতে ভালোবাসে। তীব্র আলো সহ্য করতে পারে না এই পোকা। প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, পুকুর জলাশয়ে মাছ চাষের জন্য রাতে বৈদ্যুতিক আলো জোনাকি নিধনের অন্যতম কারণ। নির্বিচারে গাছ কেটে বসতবাড়ি নির্মানের কারণেও জোনাকি পোকা হারিয়ে যাচ্ছে। জোনাকিসহ পশুপাখিদের খাবার ছিল পলাশ, মান্দার, সোনালু, হরতকিসহ বিভিন্ন দেশী গাছ গাছালির ফুল -ফল ও মধু-রস। কিন্তু বর্তমানে এসব গাছও হারিয়ে গেছে। এসব গাছের বিপরীতে গারো পাহাড়ে সেগুন, ইউক্যালিপটাস , আকাশমণির মতো বিষাক্ত গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেসব গাছ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে এবং পোকামাকড় নিধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে এমন গাছ কেটে বনবিভাগকে পরিবেশ বান্ধব গাছ রোপণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বেনীরগোপ গ্রামের আবুল কাশেম (৬৮) বলেন, “এক সময় ঝিনু (জোনাকি) পোকা ব্যাপক দেখা যেত। আমরা ছোটবেলা এগুলোর সাথে দৌড়ে খেলা করতাম। এখন আর এই পোকা আগের মত চোখে পড়ে না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান এই প্রতিবেদককে জানান, “জোনাকি পোকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল জলাশয়ে বাস করে। বর্তমানে মাছ চাষের কারনে জলাশয় আর স্থিতিশীল নেই। জোনাকি পোকার খাবার ও আবাসস্থল আগের মতো না থাকায় এরা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই পোকা হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ পরিবেশের ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্যের অতিরিক্ত ব্যবহার।”
জাতীয় পরিবেশবাদী সংগঠন সেইভ দ্যা নেচারের নালিতাবাড়ী উপজেলা শাখার আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম মন্ডল বলেন, “প্রয়োজন ছাড়াই গাছ কাটা এটা মানব জাতির জন্য শুভ নয়, এটা ভবিষ্যত পরিবেশের জন্য হুমকি। আর যেগুলো গাছে ফুল ফল দেইনা, পাখি বসেনা এধরনের বিদেশি গাছ গাছালি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।পোকামাকড় রক্ষায় বিদেশি গাছ লাগানো বন্ধ করতে হবে।”
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আক্তার ববি দৈনিক জবাবদিহিকে বলেন, “জোনাকি পোকা হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ দেশি গাছ কর্তন ও বিদেশী গাছ রোপণ। যেসব গাছ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক সেসব গাছ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ গাছ অপসারণ ও পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণে জনসাধারণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।