জায়েদ মাহমুদ রিজন,স্টাফ রিপোর্টার।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি খরস্রোতা নদী ভোগাইয়ের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত নয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চলছে একটি জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত টিনশেড আধাপাকা ভবনে। পর্যাপ্ত জায়গা ও নিরাপদ অবকাঠামোর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক প্রশাসনিক ও সেবামূলক কার্যক্রম। এতে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ইউনিয়নের অর্ধ লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া ইটের দেয়াল, মরিচা পড়া টিনের চাল ও খুলে পড়তে থাকা দেয়ালের পলেস্তারা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ইউনিয়ন পরিষদের ভবনটি। বৃষ্টি হলেই টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে অফিস কক্ষে, নষ্ট হচ্ছে আসবাবপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় ভবনের ভেতরে ঢুকতে ভয় পান অনেক সেবা প্রত্যাশী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন এই ভবনেই চলছে ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকাণ্ড। দেয়ালের পলেস্তারা হঠাৎ খুলে পড়ে, ঝড়ো হাওয়ায় টিনের চাল উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা সামিউল ইসলাম বলেন,
“জোরে বাতাস বইলেই আতঙ্কে থাকি। কখন যে চাল উড়ে যায় বা দেয়াল ভেঙে পড়ে বলা যায় না। এমন পরিবেশে কোনো কাজেই স্বস্তি নেই।”
বিকল্প ভবন না থাকায় বাধ্য হয়েই এই ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই চলছে চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের বসা, গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ইউপি সচিবের দাপ্তরিক কাজ এবং ডিজিটাল তথ্যসেবা কেন্দ্রসহ সব কার্যক্রম। একসঙ্গে একাধিক কাজ পরিচালনা করা সম্ভব না হওয়ায় একটি সেবা দিতে গিয়ে বন্ধ রাখতে হচ্ছে আরেকটি। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
ভবনের ভেতরে একসঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জনের বেশি দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকায় অনেক সময় খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে সেবা নিতে হয় ইউনিয়নের নাগরিকদের। এতে সময় ও শ্রম দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
নয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শরীফ আল ফায়েদ জানান,
“বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে পানি পড়ে অফিসের ভেতরে ঢুকে যায়। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও আসবাবপত্র ভিজে নষ্ট হয়। একটি ছাদের নিচে ইউনিয়নের সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।”
ইউনিয়ন পরিষদের ভবন না থাকায় ত্রাণ কার্যক্রমেও পড়তে হচ্ছে চরম বিপাকে। পরিষদের নিজস্ব গুদাম না থাকায় ভিজিডি ও ভিজিএফসহ সরকারি চাল পাশের বিদ্যালয়ের কক্ষ বা অন্যত্র সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে চাল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও সৃষ্টি হচ্ছে।
এ বিষয়ে নয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন,
“দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি সরকারি ত্রাণ বিতরণে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। স্বাচ্ছন্দ্যে মিটিং করার মতো পরিবেশ নেই, গ্রাম আদালত পরিচালনার উপযোগী জায়গাও নেই। একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এখন সময়ের দাবি।”
এ বিষয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার ববি বলেন,
“নয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের জরাজীর্ণ ভবনের বিষয়টি আমাদের জানা আছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হলে নয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের ভবনও অন্তর্ভুক্ত হবে।”
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই নির্মিত এই ভবনে ১৯৮৩ সাল থেকে নয়াবিল ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এর আগে এটি রামচন্দ্রকুড়া মণ্ডলিয়াপাড়া ইউনিয়ন ও নয়াবিল ইউনিয়নের যৌথ পরিষদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে সংস্কারহীন এই ভবনটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি আধুনিক ও নিরাপদ ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।