আমানুল্লাহ আসিফ মীর: আগুনে পুড়লো দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়। ক্ষতিগ্রস্ত হলো ভবন, সরঞ্জাম, বন্ধ রয়েছে পত্রিকা প্রকাশ। সংবাদকর্মীদের মাঝে দেখা যাচ্ছে বেদনাময় আর্তনাদ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভবন বা সরঞ্জামের কি ছিল অপরাধ? অল্প কয়টা টাকার জন্য কর্মরত সংবাদকর্মীদেরই কি আছে কোন দোষ বা অপরাধ? মাথায় নুন্যতম জ্ঞান থাকলে এর উত্তর আসবে না। তাদের পুড়তে হলো কেন তাহলে? এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ হলেও অনেক কঠিন মনে হচ্ছে কারো কারো কাছে। আমার ছোট্ট মাথায় যে উত্তর আসে তা হলো তারা মবের স্বীকার হয়েছে।
একটি গনমাধ্যমের নিজস্ব কিছু আইডোলজি থাকে, সেটা মূলত পরিচালিত হয় সম্পাদকীয় লেবেল থেকে। কর্মরত প্রতিবেদকরা তাই বাস্তবায়ন করে নিজ দায়বদ্ধতা থেকে, বেতন ভাতার দিক চেয়ে। সম্পাদকীয় আইডোলজি ভিন্নমত হওয়ার দায় কেন প্রতিবেদক বা ডেস্কে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিবে? কোন গনমাধ্যমের কার্যক্রম আপনার ভালো না লাগলে বয়কট করতে পারেন, আক্রমণ করার অধিকার তো আপনাকে কেউ দেয়নি। এরচেয়ে বেশি সক্ষমতা যদি আপনার থাকে তাহলে নতুন আঙ্গিকে গনমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়ে দিতে পারেন।
এবার আসা যাক গতকালকের আগুনের বিষয়ে। শুরুতেই দুটি গনমাধ্যমে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আমি ক্ষুদে সংবাদকর্মী হিসেবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। প্রতিবাদ জানালেই কি হবে? যা ক্ষতি হবার তা তো হয়েই গেছে। তারপরও এই প্রতিবাদ এখন সান্ত্বনার স্বার্থেই জানানো হয়ে থাকে প্রতিনিয়তই। তবে এই আগুনের দায় কে নিবে? কার কাঁধেই বা চাপানো হচ্ছে? লক্ষ্য করলাম কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের উপর দায় চাপাতে চেষ্টা করছে! অথচ সরকার প্রধান দুই গনমাধ্যমের সম্পাদকের সাথে কথা বলে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। বৃহৎ একটা অংশ এই দায় তুলে দিয়েছে হাদী সমর্থক বা ইনকিলাব মঞ্চের উপরে! আসলেই কি তাই? এই কাজের সাথে কি ইনকিলাব মঞ্চ জড়িত রয়েছে? এটা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য নয়, কারণ শরীফ ওসমান হাদী নিজে এসব থেকে বিরত থাকার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি কখনোই এসব হামলার পক্ষে ছিলেন না। তাহলে আগুনের দায় কার? আমার ছোট্ট মাথায় বড় কিছু হয়তো নাও ধরতে পারে। তবে ধারনা মতে এই আগুন সুযোগ সন্ধানীরা দিয়েছে। হাদী মারা গেছে দেশ যখন উত্তাল হয়েছে ঠিক তখনই তারা সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে মব সৃষ্টি করেছে। আর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সেই দায় ইনকিলাব মঞ্চের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে! হাদীর উপর হামলা যেমন তাদের পূর্বপরিকল্পিত ছিল ঠিক তেমনি প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের আগুনের ক্ষেত্রেও একই হয়েছে। সর্বোপরি বলা যায় অন্তর্বর্তী সরকার বা ইনকিলাব মঞ্চ নয় এই আগুন তৃতীয় পক্ষের হাত থেকেই ছড়িয়েছে।
এবার আসা যাক কিছু তথাকথিত সুশীলের প্রতিবাদের বিষয়ে, প্রতিবাদ নিঃসন্দেহে সুনাগরিকের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু স্থান কাল পাত্র ভেদে প্রতিবাদ অবশ্যই ভন্ডামির বহিঃপ্রকাশ। আপনারা আজকে খুব প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, জানান, এটা ভালো। কিন্তু আপনার প্রতিবাদে কেন থাকবে উষ্কানি বা অযৌক্তিক দায় চাপানো। এবার হয়তো বলবেন আমরা সবসময়ই প্রতিবাদ করে থাকি। তাহলে আমার দেশ, ইনকিলাব, সংগ্রাম, দিনকাল এসব গনমাধ্যমের উপর যখন আক্রমণ হতো, প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হতো, সম্পাদককে লাঞ্চিত করা হতো তখন আপনাদের প্রতিবাদ কোথায় ছিল?
গনমাধ্যমের উপর আক্রমনের সঠিক তদন্ত হোক, অপরাধী শনাক্ত করে সুষ্ঠু বিচার হোক। কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেই এসব স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। কিন্তু বাংলাদেশে বরাবরই সংবাদপত্র আর সাংবাদিকদের উপর আক্রমনের কাঙ্ক্ষিত বিচার হয় না। দিনের পর দিন শুনানি আর আশ্বাসের নিচে চাপা পড়ে যায় বিচার। আর্তনাদ নিয়েই যুগ যুগ কাটিয়ে দেয় পরিবার। এজন্যই অপরাধীরা পুনরায় আক্রমণের সাহস পায়।
পরিশেষে, গতকাল খুলনায় একজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, দুটি গনমাধ্যমে আগুন দেওয়া হয়েছে, এসব ঘটনার দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে নিজ অবস্থান থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ প্রকাশ করছি।