আমানুল্লাহ আসিফ মীর, স্টাফ রিপোর্টার:
“শীতের দিনে, শিশির ভেজা,খেজুর গাছে রসের দেখা। গাছি ভাইয়ের মধুর হাসি,রস পানে মন মাতামাতি।”
উপরের পঙ্ক্তির মতোই শীতের কুয়াশামাখা ভোরে খেজুরের রসে মুখর হয়ে ওঠে গারো পাহাড়ি অঞ্চল। সূর্যের আলো না ফুটতেই রস নামাতে গাছে উঠে পড়েন গাছিরা। সকাল সকাল এই রস খেতে ভীড় করেন অনেকেই। মিষ্টি খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা হয় রসালো বিভিন্ন পিঠাপুলি।
দেশের বিভিন্ন জায়গার মতো ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কোলঘেঁষা শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ি অঞ্চলের খেজুরের রসের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের কয়েক এলাকায়। সড়কের দুই পাশে সারি সারি খেজুরের গাছ থেকে রস নামানো হয় প্রতিবছর শীতকালে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে রস পিপাসুদের ভীড় জমে যায় গাছের নিচে। গাছিরাও তড়িঘড়ি করে রস নামিয়ে বিক্রি করছেন বিভিন্ন দামে।নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা ইকোপার্কে যাওয়ার পথে এই চিত্রের দেখা মিলে। শুধু মধুটিলা ইকোপার্ক নয় এই উপজেলার একাধিক স্থানে এমন খেজুরের রসের সমাহার রয়েছে। উপজেলার মরিচপুরান ইউনিয়নের গোজাকুড়া ও মাথাফাটা বাজার এলাকাতেও গাছ কেটে খেজুরের রস নামিয়ে নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিক্রি করছেন স্থানীয় গাছিরা।
গাছিদের দেওয়া তথ্যমতে, একটি খেজুর গাছ থেকে দৈনিক ৩-৫ লিটার রস নামানো যায়। প্রতি লিটার রস ৮০-১২০ টাকা মূল্যে বাজারে বিক্রি করা যায়। তবে লিটারের চেয়ে গ্লাস প্রতি ক্রয়ের ক্রেতার সংখ্যায় বেশি। স্থানীয় পর্যায়ে ১০-২০ টাকা গ্লাস রস বিক্রি হয়ে থাকে। গারো পাহাড়ি অঞ্চলের খেজুরের রস এলাকার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাইরের এলাকাতেও সরবারহ করা হয় বলে জানান গাছিরা।
স্থানীয় গাছি আমির হামজা (৩৫) বলেন, ‘১০ থেকে ১২ দিন হলো খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু করেছি। শুরুর দিকে হওয়ায় এখন রস পড়ছে কম। প্রতিদিন ৭ টা গাছ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লিটার রস পড়ে। এবং প্রতি লিটার রস ১০০ টাকা করে বিক্রি করছি। শীত একটু জেঁকে বসলে রস ভালো পড়বে। তখন রস আরো মিষ্টিও হবে।’
নকলা শহর থেকে খেজুরের রস খেতে আসা হাসান মিয়া বলেন, ‘এই রস অনেক মিষ্টি। খাওয়ার পাশাপাশি বাড়ির জন্যও নিয়ে যাচ্ছি। আমরা মাঝেমধ্যেই খেজুরের রস খেতে আসি।’
গোজাকুড়া এলাকার কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী সাজন চন্দ্র শীল বলেন, ‘শীতের সকালে খেজুরের রস খেতে অনেক সুস্বাদু এবং মিষ্টি।’
সূত্রমতে, খেজুরের রস থেকে গুড় (ঝোলা গুড়, পাটালি গুড়, নলেন গুড়), মিষ্টি, পায়েস, ফিরনি, পিঠা-পুলি (ভাঁপা পিঠা, চিতই পিঠা) ইত্যাদি তৈরি হয়। যা শীতের অন্যতম আকর্ষণ এবং বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি সরাসরি পানীয় হিসেবেই গ্রাম অঞ্চলে বেশি খাওয়া হয়ে থাকে।
খেজুরের রসে প্রাকৃতিক শক্তি, ভিটামিন (C, B), মিনারেল (পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন) ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। যা দ্রুত শক্তি জোগায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজমে সাহায্য করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং দুর্বলতা দূর করে।
তবে কাঁচা রস পান করলে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকিও রয়েছে। নিপা ভাইরাসের ক্ষতি মারাত্মক, যা জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্টের মতো ফ্লু-এর লক্ষণ থেকে শুরু করে মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) সৃষ্টি করে, যার ফলে বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, কোমা এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই খেজুরের রস ফুটিয়ে পান করা নিরাপদ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।