স্টাফ রিপোর্টার:ডুগডুগির সেই চেনা শব্দ আর ঝাপি হাতে বেদেদের আনাগোনা, এক সময় গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য হলেও আধুনিকতার স্রোতে আজ তা প্রায় বিলুপ্ত। তবে দীর্ঘদিন পর আবারও সেই হারিয়ে যাওয়া যাযাবর জীবনের এক খণ্ড চিত্র দেখা মিলেছে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার শেষ সীমানা পেরিয়ে ঝিনাইগাতি উপজেলার প্রবেশদ্বার, তিনানি বাজারের ঠিক পশ্চিম পাশে।
সম্প্রতি সেখানে অস্থায়ী ডেরা ফেলেছে একদল বেদে পরিবার। স্থায়ী ঠিকানা ও নাগরিক পরিচয় থাকলেও পূর্বপুরুষের পেশা ও ঐতিহ্যের টানেই তারা বছরে নির্দিষ্ট কিছু সময় তাবু খাটিয়ে এভাবে জীবনযাপন করেন।
বেদেদের জীবন মানেই রহস্য আর রোমাঞ্চ। একসময় সাপের খেলা, বানরের খেলা, তুকতাক জাদু, মন্ত্র পড়ে চাল পড়া দেওয়া কিংবা নানা কৌশল দেখিয়ে তারা গ্রামবাসীর বিনোদনের বড় উৎস ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে।
তিনানি বাজারের ডেরায় বেদে সদস্য কাসেম আলী (৫৫) বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে সাপ আর বানরের খেলা দেখিয়ে চাল-পয়সা পেয়েছি। এখন মানুষের হাতে স্মার্টফোন, আমাদের খেলার চেয়ে ইন্টারনেটের বিনোদনের কদর বেশি। তবুও শেকড়ের টানে বছরে একবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি।
বেদেরা মূলত ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন। একই সঙ্গে তাদের সমাজে লোকজ বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক চর্চার প্রভাবও রয়েছে। মসজিদে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি ওঝাগিরি ও মন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস তাদের সংস্কৃতির অংশ। বিশেষ মন্ত্রের মাধ্যমে বিষ নামানো বা উপরি বান দূর করা সম্ভব, এমন ধারণাও তাদের মধ্যে প্রচলিত।
বেদে সমাজে নারীর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বিবাহ রীতি সাধারণ সমাজের চেয়ে ভিন্ন। বিয়ের ক্ষেত্রে কনের মতামতের পাশাপাশি বরের সাহসিকতা ও দক্ষতাও বিবেচনা করা হয়। একসময় সাপ ধরতে বা সাপের খেলা দেখাতে অক্ষম কোনো যুবকের বিয়ে করা কঠিন ছিল।
অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের পর বরকে কনের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হয়, যা তাদের প্রাচীন সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন। বেদে সমাজে দ্বৈত বা বহুবিবাহের চল থাকলেও তা নির্দিষ্ট সামাজিক নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কোনো পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ও সমাজপ্রধানের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে নারীরা বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং সমাজ তা মেনে নেয়।
বিয়ের অনুষ্ঠানে নিজেদের তৈরি গান ও নৃত্যের মাধ্যমে রাতভর আনন্দ করে তারা। অনেক সময় যৌতুক হিসেবে সাপের ঝাপি বা জাদুর সামগ্রী আদান-প্রদান করা হয়, যা তাদের ঐতিহ্যেরই অংশ।
তিনানি বাজারের ডেরায় থাকা এক তরুণ বেদে বলেন,
দালান-কোঠায় থাকলেও আমাদের রক্তে যাযাবর টান আছে। ডুগডুগির শব্দই আমাদের প্রতি বছর ঘর থেকে বের করে আনে।
স্থানীয় সৌদি প্রবাসী মোঃ রায়হান বলেন, আধুনিক পেশার সঙ্গে তাদের যুক্ত করার পাশাপাশি এই স্বতন্ত্র সংস্কৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ না নিলে অচিরেই হারিয়ে যাবে ডুগডুগির সেই মায়াবী সুর।
বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বেদেদের এই লোকজ সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির মুখে। মানুষ এখন বিনোদনের জন্য ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সাপের খেলা বা বানরের খেলা নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা।
স্থানীয়দের মতে, বহু বছর পর তিনানি বাজার এলাকায় এমন বেদে ডেরার দেখা মিলেছে।এই যাযাবর মানুষগুলো বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিনিধি।