
জায়েদ মাহমুদ রিজন, স্টাফ রিপোর্টার।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের একই নামের গ্রামে এখনো জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বটগাছ। স্থানীয়দের মতে, গাছটির বয়স প্রায় আড়াই শত বছর। সময়ের বহু উত্থান-পতন পেরিয়ে এটি এখন শুধু একটি গাছ নয়, এলাকার মানুষের বিশ্বাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাছটির বিশাল ডালপালার নিচে প্রতিদিন আশ্রয় নেয় নানা প্রজাতির পাখি। মৌমাছিরাও এটিকে তাদের স্থায়ী ঠিকানা বানিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পুরো গাছজুড়ে ঝুলে থাকে ২০ থেকে ২৫টি মৌচাক।
গাছের ঠিক পাশে রয়েছে একটি প্রাচীন মাজার, যা স্থানীয়দের কাছে সমানভাবে পবিত্র ও ঐতিহ্যমণ্ডিত। প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় ওরস মোবারক, যা এখন স্থানীয়ভাবে একটি বড় ধর্মীয় উৎসবে রূপ নিয়েছে। ওরস উপলক্ষে শুধু নালিতাবাড়ী বা শেরপুর নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো ভক্ত ও পাগল এখানে জড়ো হন। কেউ মানত পূরণে আসেন, কেউ দোয়া চান, আবার কেউ সারারাত জিকির ও সঙ্গীতে মেতে থাকেন। এ সময় পুরো রামচন্দ্রকুড়া গ্রাম জেগে ওঠে আধ্যাত্মিক পরিবেশে।
মাজারের খাদেম মো. ফজর আলী ফকির জানিয়েছেন, প্রতি বছর গাছের মৌচাক থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লিটার (প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ কেজি) প্রাকৃতিক মধু সংগ্রহ করা হয়। তিনি বলেন, “এই গাছ আর মাজার যেন একে অপরের পরিপূরক। গাছটা আমাদের এলাকার সৌভাগ্য। বর্ষায় যখন মৌমাছিরা আসে, তখন আমরা প্রাকৃতিকভাবে মধু সংগ্রহ করি।এই মধু শুধু খাদ্য নয়, আমাদের কাছে এটা আল্লাহর দেওয়া আশীর্বাদ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই স্থানেই পাকিস্তানি সেনাদের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল। তারা গাছ কেটে দেয়নি, কেবল ঘন ডালপালা কেটে ফেলে কারণ দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে চারপাশ নজরদারি করছিল। যুদ্ধ শেষে গাছটি আবারও নতুন প্রাণে বেড়ে ওঠে এবং আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।”
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, রামচন্দ্রকুড়ার এই আড়াই শত বছরের বটগাছ প্রকৃতির এক অনন্য নিদর্শন। এটি যেমন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করছে, তেমনি ধারণ করে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গভীর প্রতিচ্ছবি। গাছটির ছায়াতলে আজও টিকে আছে গ্রামের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও মানুষের আত্মিক বন্ধন।